“হজের সমতুল্য সওয়াবের অনন্য এক সুযোগ রমাদানের উমরা”
ইসলামের দৃষ্টিতে রমাদান হলো রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নেক আমলের প্রতিদান বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। আর এই পবিত্র মাসে উমরা আদায় করা এমন একটি ইবাদত, যার ফজিলত সম্পর্কে স্বয়ং নবীয়ে কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ সুসংবাদ দিয়েছেন।
এই লেখায় আমরা জানব—
- রমাদানে উমরার ফজিলত কেন এত বেশি,
- এ বিষয়ে নবীয়ে কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর হাদিস,
- সাহাবীদের আমল ও দৃষ্টান্ত,
- এবং আমাদের জন্য এর শিক্ষাগুলো কি?
রমাদানে
উমরার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক মহিলা নবীয়ে কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–কে বললেন যে তিনি হজ করতে পারেননি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
“তুমি
রমাদানে উমরা আদায় করো,
কেননা রমাদানে উমরা করা একটি
হজের সমান।”
(সহিহ বুখারি: ১৭৮২, সহিহ মুসলিম: ১২৫৬)
অন্য
বর্ণনায় এসেছে:
“রমাদানে
উমরা করা আমার সাথে
হজ আদায় করার সমতুল্য।”
আলেমগণ
ব্যাখ্যা করেছেন—এর অর্থ সওয়াবের
দিক থেকে হজের সমান,
তবে ফরজ হজের বিকল্প
নয়। অর্থাৎ, কারও উপর ফরজ
হজ থাকলে তা আলাদা করেই
আদায় করতে হবে।
কেন
রমাদানে উমরার সওয়াব এত বেশি?
১.
রমাদান নিজেই ফজিলতের মাস
এই মাসে:
- শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়,
- জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়,
- জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়,
- প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
২.
পবিত্র সময় ও পবিত্র স্থানের সংমিশ্রণ
মক্কা
নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান, আর রমাদান সর্বশ্রেষ্ঠ
মাস। এই দুইয়ের মিলনে
ইবাদতের মর্যাদা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি
পায়।
৩.
কষ্ট ও ত্যাগের কারণে বেশি প্রতিদান
রমাদানে
উমরা করা শারীরিকভাবে তুলনামূলক
কষ্টকর—গরম, ভিড়, রোজা
থাকা অবস্থায় ইবাদত—এই কষ্টের কারণেই
আল্লাহ তাআলা বিশেষ প্রতিদান দান করেন।
রাসূলুল্লাহ
ﷺ এর জীবনে রমাদান ও উমরা
ইতিহাস
অনুযায়ী, নবীয়ে কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে মোট
চারটি উমরা করেছেন:
- উমরাতুল হুদাইবিয়া (৬ হিজরি – বাধাগ্রস্ত)
- উমরাতুল কাজা (৭ হিজরি)
- জি'রানা থেকে উমরা (৮ হিজরি)
- হজের সাথে উমরা (১০ হিজরি)
এসব উমরা সরাসরি রমাদান মাসে সংঘটিত না হলেও, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে উম্মতকে রমাদানে উমরার ফজিলতের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর উম্মতের জন্য সহজ ও বরকতময় পথ খুলে দিতে চেয়েছেন।
সাহাবীদের
জীবনে রমাদানে উমরা
সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর এই হাদিস শোনার পর রমাদানে উমরা পালনে বিশেষ আগ্রহী হতেন।
বিশেষ
করে:
- আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)
- আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)
- আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)
তাঁরা
রমাদানে মক্কায় অবস্থান করতেন এবং ইবাদতে নিজেদের
সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করতেন—তাওয়াফ, কুরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত ও
দোয়ায় সময় কাটাতেন।
তাদের
জীবনের মূল শিক্ষা ছিল—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুযোগ পেলেই
নেক আমলকে বেছে নেওয়া।
আমাদের
জন্য শিক্ষা
১. নেক আমলের মৌসুমকে
চিনে নেওয়া – রমাদান হলো বিনিয়োগের সেরা
সময়।
২. সামর্থ্য থাকলে রমাদানে উমরার পরিকল্পনা করা।
৩. শুধু সফর নয়,
ইখলাস ও তাকওয়াই আসল
উদ্দেশ্য করা।
৪. উমরা করতে না
পারলেও রমাদানে বেশি বেশি নেক
আমল করা—কারণ আল্লাহ এর প্রতিদান বাড়িয়ে দেন।
রমাদানে উমরা কোনো সাধারণ ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নিয়ামত ও সুযোগ। হজের সমতুল্য সওয়াবের প্রতিশ্রুতি আমাদের জন্য প্রেরণা হওয়া উচিত, যেন আমরা এই মাসকে অবহেলা না করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমাদানের মর্যাদা বোঝার তাওফিক দান করুন এবং অন্তত একবার হলেও এই পবিত্র মাসে তাঁর ঘরে হাজির হয়ে উমরা আদায় করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
